তিন কন্যা-:Prothom Alo- ১৮ নভেম্বর ২০১৯,

১৯ নভেম্বর নারী উদ্যোক্তা দিবস। ২০১৪ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে দেশে দেশে এই দিবস উদ্‌যাপিত হয়। বাংলাদেশেও হয় নানা আয়োজন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে নারী উদ্যোক্তাদের দিগন্ত প্রসারিত হচ্ছে। প্রচলিত উদ্যোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগেও নেমে পড়ছেন আমাদের নারী উদ্যোক্তারা। এমন তিন কন্যার উদ্যোগ নিয়ে লিখেছেন মুনির হাসান

রাজধানীর হাজারীবাগের কারখানায় মাকসুদা খাতুন। ছবি: জাহিদুল করিম
রাজধানীর হাজারীবাগের কারখানায় মাকসুদা খাতুন। ছবি: জাহিদুল করিম

৩. মাকসুদা খাতুনের শাবাব লেদার
স্কুলে পড়ানোর কাজ ছেড়ে বায়িং হাউসে চাকরি নিয়েছেন। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক এবং এক অংশীদারের সঙ্গে শিল্পের জন্য চামড়ার দস্তানা তৈরি করে জাপানে পাঠান। ভালোই চলছিল। কিন্তু ছয় বছর আগে একদিন সকালে জানা গেল, স্বামীর প্রতিষ্ঠানের ৬৫ লাখ টাকার মালামাল গায়েব হয়ে গেছে! মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও নিজে ভেঙে পড়লেন না। কেরানীগঞ্জের জমি আর নাকফুল রেখে বাকি সব গয়না বিক্রি করে দিলেন। ডিপিএস এবং জীবন বিমার পলিসি, ভাঙালেন সবই।খরচ কমানোর জন্য রামপুরা থেকে কাঁচপুরে বাসা নিয়ে গেলেন। প্রতিদিন স্বামীকে অফিসে পাঠিয়ে নিজে হাজির হতে শুরু করলেন হাজারীবাগের ছোট্ট কারখানায়। দিনভর অর্ডারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। অবশেষে পাওয়া গেল চার ডজন ওয়ালেটের অর্ডার। ‘আমার প্রথম কাজ, যত্ন করে করলাম।’ হাজারীবাগে নিজের কারখানা কাম অফিসকক্ষে বললেন চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদক শাবাব লেদারের স্বত্বাধিকারী মাকসুদা খাতুন। ‘কিন্তু জানাশোনা ও যোগাযোগ বাড়াতে পারছিলাম না। এরপর খোঁজ পেলাম “চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’’ প্ল্যাটফর্মের। যোগ দিলাম মিরপুরের উদ্যোক্তা হাটে।’ সেখানে বেচাকেনা বেশি না হলেও আগ্রহী ক্রেতাদের সামনে নিজের পণ্যের সমাহার তুলে ধরতে পারলেন মাকসুদা। চামড়ার তৈরি লেডিস ও জেন্টস ব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট, মিনি ব্যাগ, জ্যাকেটে আগ্রহ দেখাল প্রচুর মানুষ। হাট শেষে অনেকেই খুঁজে খুঁজে হাজির হলেন মাকসুদার ছোট্ট কারখানায়। পাওয়া গেল

উত্তরবঙ্গের দুইটি বড় চেইন স্টোরের সাপ্লাইয়ের কাজ। ধীরে ধীরে ব্যবসার প্রসার হতে থাকল। অনেক করপোরেট কাস্টমার হাজির হলেন। ‘তখন করপোরেট গিফট আইটেমও করতে শুরু করলাম। কিন্তু সবই চামড়ার।’

অর্ডার বেড়ে যাওয়ায় কারখানা বড় করতে হলো। ঠিক করলেন, ‘কাটিং থেকে ফিনিশিং’ সবই নিজের কারখানায় করবেন। নিজেও প্রশিক্ষণ নিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন, স্কিটি থেকে। কারখানা বড় করতে শুরু করলেন। কর্মীর সংখ্যা বাড়তে থাকল, নিতে হলো ব্যবস্থাপকও। ‘কর্মী ব্যবস্থাপনা নিয়েই বিপদে পড়লাম। আমি কারখানাতে না থাকলে উৎপাদন কমে যায়। আবার কারখানাতে থাকলে অর্ডারের জন্য অফিসে অফিসে যাওয়া কিংবা ঢাকা বা ঢাকার বাইরের মেলাতে অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না।’এরই মধ্যে বিভিন্নজনের মাধ্যমে দেশের বাইরেও নিজের পণ্য পাঠানো শুরু হলো। এখন তাঁর বানানো চামড়াজাত পণ্য যাচ্ছে জাপান, গ্রিস, সুইজারল্যান্ড, সৌদি আরব ও চীনে। দুই হাতে এত সব কাজ একা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ল মাকসুদার। ২৮ জন সার্বক্ষণিক কর্মী। অর্ডার বেশি থাকলে সমসংখ্যক খণ্ডকালীন কর্মীর ব্যবস্থাপনা,

অর্ডার, কারখানা, মেলা করে রাতে মেয়ের দেখভাল। অবশেষে ২০১৮ সালের শেষে স্বামী
মোহাম্মদ শোয়াইব হোসেন রাজি হলেন নিজের চাকরি ছেড়ে স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে।

এখন দুজন মিলে এগিয়ে নিচ্ছেন শাবাব লেদার। উৎপাদন ও কর্মী ব্যবস্থাপনা দেখভাল করেন শোয়াইব হোসেন। আর ‘ওনার হাতে কারখানা শপে দিয়ে আমি অর্ডার আর মেলার কাজ করি, মার্কেটিং আর বিক্রিটা সামলাই’, বললেন মাকসুদা।

মেয়ে আফরা হোসেন আর ছেলে আবরার হোসেন শাবাবকে নিয়ে এখন আবার ঢাকাতে বাসা নিয়েছেন। সামনের দিনগুলোতে রপ্তানি বাড়িয়ে নিজের একটি শোরুম করতে চান মাকসুদা। আর বাড়াতে চান আনুষ্ঠানিক রপ্তানি। সবার সহযোগিতা থাকলে স্বপ্ন পূরণ হয়েই যাবে, জন্মমাসে এমন আশার কথা জানালেন উদ্যোক্তা মাকসুদা খাতুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

X